আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পাশে আলী লারিজানি - অনলাইন সংগৃহীত ছবি
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় প্রাণ হারানোর আগেই নিজের উত্তরসূরি নির্ধারণ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি রূপরেখা তৈরি করে রেখেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৮৯ সাল থেকে প্রায় চার দশক ধরে ইরানের ধর্মীয়, সামরিক ও রাজনৈতিক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এই নেতা রোববার (১ মার্চ) ভোরে তেহরানে নিজ কার্যালয়ে হামলার সময় নিহত হন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরএনএ (IRNA) নিশ্চিত করেছে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা
ইরানি সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে খামেনি আগেই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানিকে দেশ পরিচালনার বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন।
মূলত বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে এই বিশেষ সামরিক ও রাজনৈতিক মহলের হাতেই জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তেহরানের ‘পাস্তুর কমপ্লেক্সে’ চালানো নিখুঁত হামলায় খামেনির বাসভবন ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয় ধ্বংস হয়েছে।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব ৮৮ সদস্যের ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’-এর (Assembly of Experts)। তবে গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে এক উত্তেজনার সময় খামেনি সম্ভাব্য তিনজনের একটি নামের তালিকা চূড়ান্ত করেছিলেন বলে জানা গেছে। এই তালিকায় ছিলেন:
খামেনির নিজের পছন্দের এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে যার নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে, তিনি হলেন তার মেজো ছেলে মোজতবা খামেনি (Mojtaba Khamenei)।
তবে, ২০২৬ সালের ১ মার্চের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী পরিস্থিতি অস্পষ্ট; কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে খামেনি তিনজনের একটি গোপন তালিকা রেখে গেছেন যেখানে মোজতবার নাম নেই, আবার অন্য কিছু সূত্র দাবি করছে মোজতবাকেই পরবর্তী সুপ্রিম লিডার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি ও প্রতিদ্বন্দ্বী
মোজতবা খামেনি
আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি
হাসান খোমেনি
মহম্মদ মেহেদী মীরবাঘেরি
কে এই মোজতবা খামেনি?
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু: ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনির কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদ নেই, কিন্তু তিনি বাবার দপ্তরের (Office of the Supreme Leader) নেপথ্য পরিচালক হিসেবে পরিচিত।
সামরিক সংযোগ: ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড বা আইআরজিসি (IRGC) এবং বাসিজ বাহিনীর ওপর তার গভীর প্রভাব রয়েছে, যা তাকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শক্তিশালী অবস্থান দিয়েছে।
উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া
সংবিধান অনুসারে, খামেনির মৃত্যুর পর অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস (Assembly of Experts) নতুন নেতা নির্বাচন করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগীয় প্রধান এবং একজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার সমন্বয়ে গঠিত একটি কাউন্সিল সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
এ ছাড়া খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির নাম বিভিন্ন মহলে জোরেশোরে আলোচিত হলেও, খামেনি নিজে নেতৃত্বকে বংশানুক্রমিক করার ঘোর বিরোধী ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও নেতৃত্বের সংকট
শনিবার রাত পর্যন্ত ইরানের কার্যকর নেতৃত্ব কার হাতে রয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, কিছু নেতা হারালেও ইরানের আত্মরক্ষার লড়াই থামবে না। বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠিত হতে পারে, যেখানে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্য থাকবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষজ্ঞ পরিষদের দ্রুত বৈঠকের মাধ্যমে নতুন নেতার নাম ঘোষণা করা হতে পারে। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি-র (IRGC) ভূমিকা এই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।