জমাকৃত সঞ্চয়, ডিপিএস এবং স্থায়ী আমানতের ওপর জাকাত দিন - অনলাইন সংগৃহীত ছবি
রমজান মাস এলে দেশে জাকাত আদায়ের প্রবণতা দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি সঠিকভাবে হিসাব করছি? বিশেষত ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ, সোনা-রূপা এবং ব্যবসায়িক পুঁজির ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। ফলে অনেকে কম দেন, কেউ আবার ভুল পদ্ধতিতে দেন। অথচ জাকাত কেবল দান নয়; এটি ইসলামের একটি মৌলিক ফরজ ইবাদত এবং সম্পদের পবিত্রতার উপায়।
জাকাতের মৌলিক ভিত্তি
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা সালাত কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৩)
অন্য আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে— “যারা সোনা-রূপা সঞ্চয় করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দাও।” (সুরা তাওবা, আয়াত :৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি বিষয়ের ওপর… তার একটি হলো জাকাত প্রদান।” (বুখারি, হাদিস: ৮; মুসলিম, হাদিস: ১৬)
অতএব জাকাত আদায় না করা শুধু সামাজিক দায়িত্বহীনতা নয়, বরং শরিয়তের দৃষ্টিতে গুরুতর গাফিলতি।
১. ব্যাংক ব্যালান্সে জাকাত
আধুনিক সময়ে নগদ অর্থের বড় অংশ ব্যাংকে সংরক্ষিত থাকে। শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্যাংকে জমাকৃত অর্থও নগদের অন্তর্ভুক্ত। যদি কারও মোট সঞ্চয় নিসাব পরিমাণে পৌঁছে এবং তা এক চান্দ্রবছর সময়কাল অতিক্রম করে, তবে তাকে ২.৫% হারে জাকাত দিতে হবে।
নিসাব নির্ধারণের ভিত্তি হলো সোনা বা রূপা।হাদিসে এসেছে— “যখন তোমার কাছে দুইশ’ দিরহাম (রুপা) থাকবে এবং ১ বছর পূর্ণ হবে, তখন তাতে পাঁচ দিরহাম জাকাত দিতে হবে।” (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৭৩)
আরেক বর্ণনায় সোনার ক্ষেত্রে এসেছে—
“বিশ দিনার সোনা হলে তাতে অর্ধ দিনার জাকাত।” (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৭২)
সমসাময়িক ফকিহগণ বলেন, বর্তমান কাগুজে টাকা রুপার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে নিসাব নির্ধারণ করা অধিক উপযোগী, যাতে বেশি মানুষ উপকৃত হয়। সুতরাং ব্যাংক ব্যালান্স, হাতে নগদ অর্থ, মোবাইল ওয়ালেট বা ফিক্সড ডিপোজিট—সব মিলিয়ে নিসাব অতিক্রম করলে জাকাত ফরজ হবে।
যদি ব্যাংকে মুনাফা বা সুদ যুক্ত হয়, তবে সুদ বৈধ সম্পদ নয়; তা জাকাতের অংশ হিসেবে গণ্য হবে না।বরং সুদের অংশ সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করে দিতে হবে।
২. সোনা-রুপায় জাকাত
সোনা-রুপা জাকাতের মূল ভিত্তি। নারীদের ব্যবহার্য অলংকার নিয়েও মতভেদ রয়েছে। হানাফি মাজহাব মতে, ব্যবহার্য অলংকার নিসাব পরিমাণে পৌঁছালে তাতেও জাকাত ফরজ। অন্য মাজহাবে ভিন্নমত আছে।
হাদিসে এসেছে, এক নারী তার কন্যার হাতে ভারী সোনার বালা পরিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি এর জাকাত দাও?” তিনি বললেন, না। তিনি বললেন, “তুমি কি পছন্দ করো আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাকে আগুনের বালা পরিয়ে দিন?” অতঃপর তিনি তা খুলে দান করে দেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৬৩)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সোনা-রুপা নিছক অলংকার হলেও নিসাব অতিক্রম করলে জাকাতের আওতায় আসতে পারে।
৩. ব্যাবসায়িক পুঁজিতে জাকাত
ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পণ্য, কাঁচামাল, উৎপাদিত দ্রব্য এবং বিক্রয়যোগ্য স্টক—সবই জাকাতযোগ্য সম্পদের অন্তর্ভুক্ত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমাদেরকে ব্যবসার জন্য প্রস্তুতকৃত পণ্যে জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৬২)
হিসাবের নিয়ম হলো—
• বছরের শেষে ব্যাবসায়িক স্টকের বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করা
• নগদ অর্থ ও পাওনাযোগ্য অর্থ যোগ করা
• দায় বা ঋণ বিয়োগ করা
• অবশিষ্ট নিট সম্পদের ২.৫% জাকাত দেওয়া
এ ক্ষেত্রে অনেকে মূলধনের ওপর জাকাত দেন, কিন্তু মুনাফা বা স্টকের বাজারমূল্য হিসাব করেন না। এটি ভুল পদ্ধতি।
৪. জাকাতের উদ্দেশ্য ও সামাজিক প্রভাব
জাকাত কেবল হিসাবের বিষয় নয়; এটি আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, “তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো; এর মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে।” (সুরা তাওবা, আয়াত : ১০৩)
অন্য আয়াতে জাকাতের প্রাপকদের তালিকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)। অর্থাৎ জাকাত বণ্টনেও শরিয়তের নির্দেশ মানা আবশ্যক।
সঠিকভাবে ব্যাংক সঞ্চয়, সোনা-রুপা ও ব্যাবসায়িক সম্পদের জাকাত আদায় হলে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এতে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে এবং সম্পদের স্থবিরতা দূর হয়।
রমজানে জাকাত দেওয়ার আবেগ প্রশংসনীয়। কিন্তু আবেগের সঙ্গে সঠিক জ্ঞান না থাকলে ফরজ আদায় অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। ব্যাংক ব্যালান্স, সোনা-রুপা ও ব্যবসায়িক পুঁজির সঠিক হিসাব করে জাকাত আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের দায়িত্ব।
জাকাত শুধু সম্পদ কমায় না; বরং বরকত বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সদকা সম্পদ কমায় না।” (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)
অতএব, প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক হিসাব এবং শরিয়তের নির্দেশনা অনুসরণ। তাহলেই জাকাত হবে ইবাদত, সম্পদের পবিত্রতা এবং সমাজের কল্যাণের বাস্তব উপায় ।
ব্যক্তিগত ব্যাংক ব্যালান্স, সোনা-রুপা এবং ব্যবসার পুঁজির ওপর জাকাত হিসাব করার জন্য নিচে একটি নির্দেশিকা দেওয়া হলো:
১. জাকাত ফরজ হওয়ার সাধারণ নিয়ম
আপনার মালিকানায় থাকা যাকাতযোগ্য মোট সম্পদের মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ (৫২.৫ তোলা রুপার সমমূল্য) হয় এবং তা এক বছর আপনার কাছে জমা থাকে, তবে তার ২.৫% (শতকরা আড়াই টাকা) জাকাত দেওয়া ফরজ Islamic Foundation Bangladesh।
২. ব্যাংক ব্যালান্সের জাকাত
৩. সোনা ও রুপার জাকাত
৪. ব্যবসায়িক পুঁজির জাকাত