সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অবরোধ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার পর তেহরানের অর্থনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি অনুযায়ী, মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এই কঠোর অবরোধের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা জনমনে কিছুটা বিভ্রান্তি ও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
সাধারণভাবে কোনো দেশের ওপর অবরোধ আরোপ করা হলে সেই অঞ্চলের জলপথ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে বলে ধারণা করা হলেও, বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট ভিন্ন। হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক কৌশলগত সংযোগস্থল যা ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, তাদের এই অবরোধ মূলত ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কেন্দ্রীভূত, হরমুজ প্রণালীর ওপর নয়। ফলে যেসব জাহাজের গন্তব্য ইরান নয় বা যেসব জাহাজ ইরানের কোনো পণ্য পরিবহন করছে না, তাদের চলাচলে কোনো আইনি বাধা নেই।
আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা আইন অনুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক জলপথকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করা অবৈধ হিসেবে গণ্য হয়। মার্কিন বাহিনী এই আইনি সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন এবং সে কারণেই তারা প্রণালীটিকে সরাসরি বন্ধ না করে শুধুমাত্র ইরানগামী বা ইরান থেকে আসা কার্গোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রণালিতে জাহাজের যাতায়াত মানেই এই নয় যে অবরোধ ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি নির্দেশ করে যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যান্য ধারাগুলো এখনো সচল রাখা হয়েছে যাতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এবং অন্যান্য পণ্যের দামে বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটে।
অবরোধ কার্যকর করার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাবেক মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, ইরানকে অবরুদ্ধ করার জন্য মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে সরাসরি পারস্য উপসাগরের ভেতরে অবস্থান করার প্রয়োজন নেই। অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম, স্যাটেলাইট এবং আকাশপথের নজরদারির মাধ্যমে হাজার মাইল দূর থেকেও নির্দিষ্ট জাহাজের ওপর নজর রাখা সম্ভব হচ্ছে। কোনো জাহাজ যদি ইরানের কোনো পণ্য নিয়ে গোপনে বের হওয়ার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন বাহিনী সেই জাহাজটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমার যেকোনো স্থানে আটক করার সক্ষমতা রাখে।
তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর গতিবেগ খুব বেশি না হওয়ায় সেগুলোকে শনাক্ত করা এবং আটকানো মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য সহজতর হচ্ছে। একটি পূর্ণ বোঝাই ট্যাংকার সাধারণত প্রতি ঘণ্টায় ২০ মাইলের কম গতিতে চলে, যা একজন সাধারণ সাইকেল চালকের গতির চেয়েও কম। ফলে নজরদারি এড়িয়ে এসব জাহাজের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া প্রায় অসম্ভব। মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তারা ভারত মহাসাগর বা বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে নিয়ম ভঙ্গকারী জাহাজ জব্দ করতে পারে, যেমনটি তারা এর আগে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করে দেখিয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মানবিক দিক বিবেচনা করে এই অবরোধে কিছু শিথিলতা রাখা হয়েছে বলেও জানা গেছে। মার্কিন ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার বা আইএসডব্লিউ-এর তথ্যমতে, মানবিক ত্রাণ এবং ওষুধবাহী জাহাজগুলোকে এই অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া অবরোধ শুরুর সময় যেসব নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ ইরানের বন্দরে অবস্থান করছিল, তাদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়েছিল। এই মানবিক ছাড় এবং বিশেষ অনুমতির কারণেই কিছু জাহাজকে এখনো ওই এলাকায় চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।
অবরোধের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, এক ডজনেরও বেশি যুদ্ধজাহাজ, শতাধিক বিমান এবং ১০ হাজারেরও বেশি সেনাসদস্য এই অভিযানে সরাসরি যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বিমানবাহী রণতরী, উভচর জাহাজ এবং ডেস্ট্রয়ারের মতো আধুনিক যুদ্ধযানগুলো সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। এই বিশাল বহরটি মূলত হরমুজ প্রণালী থেকে কিছুটা দূরে আরব সাগরে অবস্থান করছে, যা ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের ছোট ছোট আক্রমণাত্মক বোটগুলোর নাগালের বাইরে।