ফাইল ছবি - অনলাইন সংগৃহীত ছবি
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন থেকে গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে আওয়ামী লীগের এক ডজনের বেশি কার্যালয়ের তালা খোলা হয়। কোথাও কোথাও তালা না খুলে কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি মূলত সরকারের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।
পাশাপাশি কারাবন্দী নেতা-কর্মীদের জামিনপ্রাপ্তি ও মুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে প্রতিবন্ধকতা আসে কি না, সেটাও দেখতে চায় দলটি।
দলটির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের আস্তে আস্তে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কিছু কিছু দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা চলছে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের নেতারা এসব উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের পরোক্ষ সহায়তা বা সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা, মধ্যম ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জামিন পেতে শুরু করলে সাংগঠনিক তৎপরতা কিছুটা বাড়বে। নেতাদের জামিন পাওয়ার বিষয়টি যাতে সহজ হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম এবং প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের সহায়তা পেতে দলটির পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। জামিন পাওয়ার বিষয়টি কিছুটা স্বাভাবিক হলে বিদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের কেউ কেউ দেশে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।তবে বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় খোলা বা সক্রিয়তা দেখানোর বিষয়টি রয়ে-সয়ে করার পক্ষে মত আছে দলটির ভেতরই। দলটির নেতাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে বিএনপি কিছুটা নমনীয় বলে মনে করছেন। তাই আওয়ামী লীগ খুব দ্রুত সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে বিএনপি রাজনৈতিক চাপে পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সংসদের বিরোধী দল জামায়া
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নেতাদের অনেকে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১০ মে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
এটা আমরা চাইনি এবং যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই এটাকে দেখা হবে সব জায়গায়।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। আওয়ামী লীগের নেতাদের কারও কারও মতে, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে অবস্থানরত নেতা-কর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব নেতা বলছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে এবং ভোট প্রতিহত করার কোনো কর্মসূচিও দেয়নি দলটি। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকার অন্তত প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান না–ও নিতে পারে।
তবে দলের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির কাছ থেকে প্রকাশ্য সহযোগিতা আশা করা ঠিক হবে না। সরকার অনেক ক্ষেত্রে ‘না দেখার’ কৌশল নিতে পারে, আবার পরিস্থিতিভেদে কঠোরও হতে পারে।
গত সোমবার বিএনপির নয়াপল্টনে কার্যালয়ে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা নিয়ে সরকারের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এটা আমরা চাইনি এবং যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই এটাকে দেখা হবে সব জায়গায়।’
ত ও এনসিপি সরকারকে আওয়ামী লীগের প্রশ্নে চাপে রাখবে। সে ক্ষেত্রে সরকার ও বিএনপি কঠোর অবস্থানও নিতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নিম্ন সারির অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হলেও তাঁদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশই গ্রেপ্তারের কয়েক মাসের মধ্যে আদালত থেকে জামিনে পেয়েছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কিংবা সাবেক জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়।
নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাবন্দী অবস্থায় মারা যান। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান ঠাকুরগাঁও–২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম। তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। এর মাধ্যমে প্রবীণ ও অসুস্থ নেতাদের মুক্তির পথ সুগম হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সদর আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজসহ তিনজন জামিন পান। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন লাভ করেছেন। এসব জামিনের ঘটনায় দলের অন্যদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেলিফোনে এই প্রতিবেককে বলেন, এখনই হয়তো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা কিংবা বড় নেতারা ছাড়া পাবেন না। তবে মধ্যম ও নিম্ন সারির নেতা–কর্মীরা ছাড়া পেলে দলে কিছুটা প্রাণসঞ্চার হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত শনিবার পর্যন্ত ১২টি জেলা ও মহানগর পর্যায়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয় খোলা হয়েছে। আরও সাত-আটটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কার্যালয় খোলা হয়েছে। তবে কিছু স্থানে আওয়ামী লীগের লাগানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপর ঢাকাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়গুলো খালি হয়ে যায়। বেশির ভাগ কার্যালয়ে আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ঢাকায় আওয়ামী লীগের তিনটি বড় কার্যালয় আছে। প্রধান কার্যালয়টি গুলিস্তানে। দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় ছিল ধানমন্ডিতে। ২০২৩ সালে তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশে বড় জায়গাজুড়ে আরেকটি কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়, যা ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় হিসেবে চালু করা হয়। তবে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় কার্যক্রমের অনেকগুলোই ওই কার্যালয়ে সম্পন্ন হতো।
এ তিনটি কার্যালয় শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর আগুন দেওয়া হয়। বিধ্বস্ত এসব কার্যালয় ১৮ মাস ধরেই পরিত্যক্ত। গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি ভবঘুরেদের বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের পতনের ৯ মাস পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়। এ সময়ে কোনো কার্যালয় খুলতে পারেননি দলটির নেতা-কর্মীরা। এ জন্য বিভিন্ন সময়ে অনলাইনে অডিও কলে কথা বলার সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। অন্তত কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি উদ্ধার করতে না পারায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।দেশে আওয়ামী লীগের একটি সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। ভোটে অংশ না নিতে দল থেকে আহ্বান থাকলেও তাঁদের অনেকেই ভোট দিয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ভোট দিয়েছেন। যাঁদের ভোট দিয়েছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে কিছুটা সহানুভূতি প্রত্যাশা করাটা অস্বাভাবিক নয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কৌশল দুই ধারায় এগোচ্ছে—মাঠে সীমিত উপস্থিতি দেখানো এবং একই সঙ্গে সরকারের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা। কার্যালয় খোলা ও জামিন প্রশ্নে সরকারের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে দলটির রাজনৈতিক পথচলা কতটা উন্মুক্ত বা সীমিত হবে।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, দেশে আওয়ামী লীগের একটি সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। ভোটে অংশ না নিতে দল থেকে আহ্বান থাকলেও তাঁদের অনেকেই ভোট দিয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ভোট দিয়েছেন। যাঁদের ভোট দিয়েছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে কিছুটা সহানুভূতি প্রত্যাশা করাটা অস্বাভাবিক নয়।
মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে হলে দেশে কার্যকর নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। কারণ, তাদের পুরো নেতৃত্বই এখন বিদেশে। এভাবে বিদেশে বসে রাজনীতি করা কঠিন। এ জন্য দেশে নেতৃত্ব লাগবে এবং বর্তমানে দেশে যাঁরা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁদের সঙ্গে একধরনের সমঝোতা করতে হবে। সেটা হয় কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।